Sunday, May 19, 2024

এক অলৌকিক মন্দির, রাখালরাজার মন্দির |


 সাধনার ভুমি বাংলার শৈব ও শাক্ত সাধনার সঙ্গে বৈষ্ণব সাধনাও ফুল ও ফলে বিকশিত হয়েছে|  শ্রীচৈতন্যদেব তো ছিলেনই,  তিনি ছাড়াও এই বাংলায় সিদ্ধ বৈষ্ণব সাধকের সংখ্যা ও নেহাত কম নয় | তেমনি রয়েছে জাগ্রত বৈষ্ণব পিঠ | এর জন্যই  পশ্চিমবঙ্গে এমন বহু বৈষ্ণব সিদ্ধ পিঠ রয়েছে যেখানে ঐশ্বরিক লীলা, কাহিনীর পর কাহিনী বুনে গিয়েছে | সেই রকমই একটি মন্দির হল ,পূর্ব বর্ধমান কালনার রাখাল রাজা মন্দির|  

পশ্চিমবঙ্গের হুগলির একটি সুন্দর গ্রাম হল "বঁইচি" গ্রাম। এটি একটি অফ বিট পর্যটন স্থান। এটি  কলকাতা থেকে সড়ক পথে মাত্র ৮০  কিমি। সেখান থেকে আমরা পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত বৈদ্যপুরে চলে যাই ৪৫০ বছরের পুরনো রাখাল রাজা মন্দির দেখতে | 

রাখাল রাজা মন্দির 


 
    এই মন্দির প্রতিষ্ঠায়  মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন  এক সিদ্ধ বৈষ্ণব পুরুষ রামকানু গোস্বামী | কালা পাহাড়ের ভয়ে তিনি    নদীয়া থেকে  কালনায় পালিয়ে এসেছিলেন  এবং  জঙ্গলের  মধ্যে  আশ্রয় নিয়েছিলেন| এই রূপ মনে করা হয় যে তিনি  বাকসিদ্ধ পুরুষ ছিলেন | তার অজান্তে  দেওয়া এক অভিশাপ  নিজের পুত্রের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল|  শোকে মর্মাহত হয়ে তিনি  সংসার ছেড়ে বৃন্দাবনে পথে রওনা দিতে চেয়েছিলেন|  কিন্তু  ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে স্বপ্নে দর্শন দেন  এবং  তাকে  আদেশ দেন  এখন যে স্থানে মন্দির রয়েছে সেখানে  মূর্তি তৈরি করে মন্দির প্রতিষ্ঠা করার জন্য | কোন কাঠ দিয়ে মূর্তি হবে এবং কে মূর্তি তৈরি করবে  তা স্বপ্নের মাধ্যমে জানান দিয়েছিলেন ভগবান|  সেই অনুযায়ী তৈরি হয় মূর্তি | স্বপ্নাদেশর  নির্দেশ এ বিগ্রহের অভিষেক হয় | এই রীতি এখনো  কালনার এই মন্দিরে চলে আসছে|  প্রতি মাঘী পূর্ণিমায়  এখানে বিগ্রহের অভিষেক করা হয়|  এই মন্দিরটির নাম রাখাল রাজা হলেও এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন  গোপীনাথ এবং  রঘুবীর|  





এছাড়া রাখাল রাজার মূর্তি তো রয়েছেই | এই মূর্তিটি  রামকানু গোস্বামীর প্রয়াত ছেলের অনুকরণে বানানো বলে অনেকে ধারণা করেন|  পরবর্তীকালে এই মূর্তির খ্যাতি এতই বাড়তে থাকে ব্রজপুরের দেবী গোপাল পাজা নামে এক ভক্ত বড় আকারের মন্দিরটি বানিয়ে দেন| এই মন্দির  চত্বরেই রয়েছে রামকানু গোস্বামীর সমাধি |

 এইবার বলি এই মন্দিরের বিশেষত্ব যার জন্য অন্যান্য মন্দির থেকে এই মন্দিরটিকে আলাদা করে|  এই মন্দির চত্বরটি অনেকটা বৃন্দাবনের নিধিবনের মতন | মন্দিরের সামনে প্রশস্ত প্রান্ত বা মাঠ রয়েছে যেখানে গরু বাছুর চড়তে পারে | আবার তার কাছেই রয়েছে বড় বড় প্রাচীন বটগাছ যার থেকে  ঝুড়ি নেমে সেটিকে আরো প্রকাণ্ড করে তুলেছে  তাদের বয়স কেউ সুনির্দিষ্ট ভাবে বলতে পারেনা | তবে ৩০০ বা ৪০০ বছর তো হবেই |বিকেল চারটে পর্যন্ত খোলা থাকে মন্দির | সূর্যাস্তের পর এই মন্দিরের কারও প্রবেশ অধিকার নেই|

সন্ধ্যের পর কাউকে এই মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না  কারণ স্থানীয় লোকেরা মনে করেন যে  সন্ধ্যের পর রাখাল রাজা এখানে , এই প্রান্তে গরু চরাতে বের হন।  অনেকেই এর সাক্ষী রয়েছেন বলে মনে করা হয়| 
 সন্ধ্যের পর অনেকেই এখানে বাঁশির আওয়াজ  গরুদের গলার ঘোমটা  ঘন্টার আওয়াজ  ইত্যাদি শুনেছেন বহুদূর থেকে। 
 এছাড়া  আমরা যখন এই মন্দিরে এসেছিলাম  এই মন্দিরের পূজারী আমাদের কাছে একটি  অলৌকিক কাহিনী বলেছিলেন|  এই মন্দিরে নাকি একবার  চোর চুরি করতে আসে মধ্যরাত্রে।   চোরটি  চুরি করতে এসেছিল রাখাল রাজার মূর্তিটিকে| কিন্তু মূর্তিটি ছোঁয়া মাত্র সে  মন্দির চত্বরেই পড়ে যায়  এবং  গোগাতে থাকে,  মুখ দিয়ে গেঁজলা বের হতে থাকে| ওঠার শক্তি হারিয়ে ফেলে সে|   পরে গ্রামের লোকেরা এসে তাকে ওই অবস্থায় দেখে বুঝতে পারে পুরো ঘটনা।  সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়|  কিন্তু  সেই লোকটি বেশিদিন বাঁচেনি|  ফলে মন্দির সম্বন্ধে যে অলৌকিক ধারণা সবার মনের মধ্যে ছিল তা আরো বদ্ধমূল হয়ে ওঠে |




Rakhal Raja Mandir



জোড়বাংলা পদ্ধতিতে এই মন্দির নির্মিত হয়। দুটি পাশাপাশি দোচালা কুটিরকে জোড়া করে এই মন্দির, কোনও শিখরদেশ নেই। ভেতরের অংশে রয়েছে গর্ভগৃহ এবং তার সন্মুখভাগে অর্ধমণ্ডপ। মন্দিরটি মাটি থেকে ৪ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এবং দক্ষিণমুখী। সামনে একটি নাটমণ্ডপ আছে। নাটমণ্ডপটি দাঁড়িয়ে আছে ১২টি থামের ওপর যে থামগুলিতে রয়েছে শ্রীকৃষ্ণের লীলা সম্বলিত চিত্র। মন্দির অভ্যন্তরে রয়েছে গোপীনাথ ও রাখালরাজের দারুবিগ্রহ। গোপীনাথ ত্রিভঙ্গঠামে দণ্ডায়মান বংশীধারী কৃষ্ণ। রাখালরাজ গোচারণরত শ্রীকৃষ্ণ সোজাভাবে দণ্ডায়মান। বিগ্রহদের পূজা চলাকালীন ওই নাটমন্দিরে চলতে থাকে নামসংকীর্তন। প্রায় ৪০০ জন লোক একসঙ্গে বসার সুযোগ আছে নাটমন্দিরে।


 প্রতিবছর মাঘ-ফাল্গুন মাসে রাখালরাজের অঙ্গরাগ হয়। তার পর হয় অভিষেক। রাখিপূর্ণিমার দিন অভিষেক হয়। নাটমন্দিরের ১০ ফুট পূর্ব দিকে মন্দিরের আদলে তৈরি অভিষেকের জায়গা। মন্দিরের ১০০ ফুট সামনে গিরিগোবর্ধনের মন্দির। মন্দিরে একটি গরু শায়িত অবস্থায় আছে। কালী পূজার পরের দিন প্রতিবছর গো-পার্বণ উপলক্ষ্যে গোবর্ধন পূজা হয়ে আসছে। বছরের বিশেষ দিনে বিশেষ পূজা হয়। জন্মাষ্টমীতে তেমন পূজা হয়। ওই দিন রাতে অন্নভোগ হয় এবং অন্নভোগের সঙ্গে কচুর শাকের ঘণ্ট অবশ্যই থাকবে। পরদিন নন্দোৎসব। এই উৎসবে সংকীর্তন তো হয়ই, তাছাড়াও নারকেল কাড়াকাড়ি, দইয়ের হাঁড়ি ভাঙা প্রভৃতি মজার অনুষ্ঠান পালিত হয়। রামনবমীর দিনে পালিত হয় রাখালরাজার দোল উৎসব। গোবর্ধন মন্দিরের পাশেই যে দোল মন্দির রয়েছে সেখানে গোপীনাথ জীউ রাখালরাজ ওঠেন রাজবেশ পরিহিত অবস্থায়। আগের দিন চাঁচর উৎসবে প্রচুর বাজি পোড়ানো হয়। দোল উপলক্ষ্যে মেলা বসে। মন্দিরের পেছনে একটি বড় ইঁদারা আছে। তার জল ভোগের কাজে ব্যবহৃত হয়। এখানকার বৈশিষ্ট্য হল, কোনও ভক্ত গেলে প্রসাদ গ্রহণ না করে ফেরেন না। তবে সকাল ১০ টার মধ্যে গেলে সুবিধা হয় সেবাইতগণের পক্ষে। রাখালরাজা অঞ্চলের জাগ্রত দেবতা। ভক্তদের বিশ্বাস, তিনি রাত্রে এখানে গোচারণ করেন তাই মন্দির চত্বরে কারও থাকা নিষেধ। তো গেল ভক্ত দেবতার সংবাদ। এসব বাদ দিয়েও জায়গাটি গাছপালায় ঘেরা এক মনোরম স্থান। নাটমন্দিরকে ঘিরে রেখেছে বট, অশত্থ, বেল, বকুল তমাল। আছে ফাঁকা প্রান্তর, নাটমন্দিরের পশ্চিমে বড়সড় খেলার মাঠ। শীতকালে দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন আসেন পিকনিক করতে। জায়গাটিতে পৌঁছলে একলহমায় মন ভাল হয়ে যায়।








Thursday, May 16, 2024

কোলকাতার কাছেই বেড়ানোর নতুন ঠিকানা ,শংকর মঠ ও মিশন, বারাসাত

 

কীভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরে চলে আসুন বারাসত রেল স্টেশনে। সেখানে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের টিকিট কাউন্টারের সামনে দিয়ে বের হয়ে টোটো ধরে নিন। চলে আসুন চাঁপাডালি মোড়ে। সময় লাগবে ১০ মিনিট। ভাড়া ১০ টাকা। চাঁপাডালি মোড় থেকে রাস্তা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। একটি রাস্তা চলে যাচ্ছে বনগাঁর দিকে। অন্যটি যাচ্ছে টাকি হয়ে বসিরহাটের দিকে। চাঁপাডালি মোড় থেকে যেতে হবে টাকি-বসিরহাটের দিকে। আর গাড়ি নিয়ে আসলে মধ্যমগ্রাম হয়ে আসতে হবে বারাসত চাঁপাডালি মোড়ে। সেখান থেকে যেতে হবে টাকি বা বসিরহাটের দিকে। অথবা, চাঁপাডালি মোড়ে অটোয় উঠে বলতে হবে বারাসত বাস ডিপো স্টপেজে যাবেন। ভাড়া ১০ টাকা। বারাসত বাস ডিপোয় নামলেই দেখা যাবে শংকর মঠ মিশনের তোরণ। যেখানে লেখা আছে শ্রীকৃষ্ণপুর রোড। সেই তোরণের রাস্তা দিয়ে যেতে হবে। কিছুটা এগোলেই দেখা যাবে বিশাল এক শিবমূর্তি। যেটা আসলে একটা মন্দিরের ওপর রয়েছে। তার পাশের রাস্তা দিয়ে একটু এগোলেই দেখা যাবে শংকর মঠ মিশন। তোরণ থেকে সেখানে হেঁটে যেতে সময় লাগবে পাঁচ মিনিট।

শংকর মঠ ও মিশনের মূল মন্দিরের




মন্দিরের বিবরণ 

মন্দিরের সামনে বিশাল চত্বরে। যা অসংখ্য গাছ-গাছালিতে ভরা। আর, মন্দির চত্বরে মূল মন্দিরের প্রায় পাশেই রয়েছে জ্যোতিশ্বরানন্দ আই ফাউন্ডেশন। যেখানে বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা, ছানি অপারেশন, ডায়াবেটিক ক্যাম্প, মেডিসিন, হোমিও ও স্বাস্থ্য শিবির বসে। ২০০৮ সালে এই মঠের উদ্বোধন হয়েছে। কলকাতায় শংকর মঠ ও মিশনের আরও চারটি মঠ আছে। পাশাপাশি রয়েছে ইংরেজি মাধ্যমের প্রাথমিক স্কুল। সঙ্গে ৫০ টাকা দিয়ে ভোগপ্রসাদের ব্যবস্থাও আছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে সবার ওপরে বেদীর ওপরে রয়েছে ওঁ-এর ধাতব আকৃতি। তার সামনে আছে শিবলিঙ্গ। যার পাশে আছে নন্দী আর পিছনে ত্রিশূল। গর্ভগৃহের সামনে নাটমন্দিরে রয়েছে আটটি পিলার। নাটমন্দিরের ওপরের কারুকার্যও দেখার মত। নাটমন্দিরে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি দরজা।




অবিভক্ত বাংলার আধ্যাত্মিক পূণ্যভূমি চট্টলার মিরেরসরাই উপজেলার রাজাপুর গ্রামে ১৩১৫ বঙ্গাব্দের ৫ই অগ্রহায়ন পরমহংস শ্রী শ্রীমৎ স্বামী জ্যোতিশ্বরানন্দ গিরি মহারাজ জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকেই তার মধ্যে মানব সেবার লক্ষণ ও ধর্মের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ পায়। ১৭ বৎসর বয়সে ঈশ্বর লাভের উদগ্র বাসনায় সংসার ত্যাগ করে আশ্রয় গ্রহণ করে তাঁর গুরু পরমহংস শ্রীমৎ স্বামী স্বরূপানন্দের চরণে। গুরুর আদেশে তিনি ১৯২১ সালে তিনি সীতাকুন্ডে প্রতিষ্ঠা করেন শংকর মঠ ও মিশন। শ্রী শংকরের জীবনাদর্শকে চলার পথের আলোকবর্তিকা হিসেবে গ্রহণ করে এতদাঞ্চলের মানুষের কাছে গীতার বাণী প্রচারের মহানব্রতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন তিনি। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা যে সময় একেবারেই অনুন্নত সে সময় তিনি পায়ে হেটে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা সহ ভারতের ত্রিপুরা, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চল পরিভ্রমণের মাধ্যমে গীতার বাণী প্রচার করেছেন। সুদীর্ঘকাল গীতার জ্যোতি ছড়িয়ে ২০০৬ সনের ০২ এপ্রিল রাত ১২টা ২০ মিনিটে স্থুল দেহ ত্যাগ করে মহাসমাধি লাভ করেন পরমহংস শ্রী শ্রীমৎ স্বামী জ্যোতিশ্বরানন্দ গিরি মহারাজ।

শিবলিঙ্গ, ওঁ-এর ধাতব আকৃতি

শ্রী শ্রীমৎ স্বামী জ্যোতিশ্বরানন্দ গিরি মহারাজ।