সাধনার ভুমি বাংলার শৈব ও শাক্ত সাধনার সঙ্গে বৈষ্ণব সাধনাও ফুল ও ফলে বিকশিত হয়েছে| শ্রীচৈতন্যদেব তো ছিলেনই, তিনি ছাড়াও এই বাংলায় সিদ্ধ বৈষ্ণব সাধকের সংখ্যা ও নেহাত কম নয় | তেমনি রয়েছে জাগ্রত বৈষ্ণব পিঠ | এর জন্যই পশ্চিমবঙ্গে এমন বহু বৈষ্ণব সিদ্ধ পিঠ রয়েছে যেখানে ঐশ্বরিক লীলা, কাহিনীর পর কাহিনী বুনে গিয়েছে | সেই রকমই একটি মন্দির হল ,পূর্ব বর্ধমান কালনার রাখাল রাজা মন্দির|
পশ্চিমবঙ্গের
হুগলির একটি সুন্দর গ্রাম হল "বঁইচি" গ্রাম। এটি একটি অফ বিট পর্যটন স্থান। এটি কলকাতা থেকে সড়ক পথে মাত্র ৮০ কিমি। সেখান থেকে
আমরা পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত বৈদ্যপুরে চলে যাই ৪৫০ বছরের পুরনো রাখাল রাজা মন্দির দেখতে |
 |
রাখাল রাজা মন্দির
|
এই মন্দির প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন এক সিদ্ধ বৈষ্ণব পুরুষ রামকানু গোস্বামী | কালা পাহাড়ের ভয়ে তিনি নদীয়া থেকে কালনায় পালিয়ে এসেছিলেন এবং জঙ্গলের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন| এই রূপ মনে করা হয় যে তিনি বাকসিদ্ধ পুরুষ ছিলেন | তার অজান্তে দেওয়া এক অভিশাপ নিজের পুত্রের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল| শোকে মর্মাহত হয়ে তিনি সংসার ছেড়ে বৃন্দাবনে পথে রওনা দিতে চেয়েছিলেন| কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে স্বপ্নে দর্শন দেন এবং তাকে আদেশ দেন এখন যে স্থানে মন্দির রয়েছে সেখানে মূর্তি তৈরি করে মন্দির প্রতিষ্ঠা করার জন্য | কোন কাঠ দিয়ে মূর্তি হবে এবং কে মূর্তি তৈরি করবে তা স্বপ্নের মাধ্যমে জানান দিয়েছিলেন ভগবান| সেই অনুযায়ী তৈরি হয় মূর্তি | স্বপ্নাদেশর নির্দেশ এ বিগ্রহের অভিষেক হয় | এই রীতি এখনো কালনার এই মন্দিরে চলে আসছে| প্রতি মাঘী পূর্ণিমায় এখানে বিগ্রহের অভিষেক করা হয়| এই মন্দিরটির নাম রাখাল রাজা হলেও এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন গোপীনাথ এবং রঘুবীর|

এছাড়া রাখাল রাজার মূর্তি তো রয়েছেই | এই মূর্তিটি রামকানু গোস্বামীর প্রয়াত ছেলের অনুকরণে বানানো বলে অনেকে ধারণা করেন| পরবর্তীকালে এই মূর্তির খ্যাতি এতই বাড়তে থাকে ব্রজপুরের দেবী গোপাল পাজা নামে এক ভক্ত বড় আকারের মন্দিরটি বানিয়ে দেন| এই মন্দির চত্বরেই রয়েছে রামকানু গোস্বামীর সমাধি |
এইবার বলি এই মন্দিরের বিশেষত্ব যার জন্য অন্যান্য মন্দির থেকে এই মন্দিরটিকে আলাদা করে| এই মন্দির চত্বরটি অনেকটা বৃন্দাবনের নিধিবনের মতন | মন্দিরের সামনে প্রশস্ত প্রান্ত বা মাঠ রয়েছে যেখানে গরু বাছুর চড়তে পারে | আবার তার কাছেই রয়েছে বড় বড় প্রাচীন বটগাছ যার থেকে ঝুড়ি নেমে সেটিকে আরো প্রকাণ্ড করে তুলেছে তাদের বয়স কেউ সুনির্দিষ্ট ভাবে বলতে পারেনা | তবে ৩০০ বা ৪০০ বছর তো হবেই |বিকেল চারটে পর্যন্ত খোলা থাকে মন্দির | সূর্যাস্তের পর এই মন্দিরের কারও প্রবেশ অধিকার নেই|
সন্ধ্যের পর কাউকে এই মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না কারণ স্থানীয় লোকেরা মনে করেন যে সন্ধ্যের পর রাখাল রাজা এখানে , এই প্রান্তে গরু চরাতে বের হন। অনেকেই এর সাক্ষী রয়েছেন বলে মনে করা হয়|
সন্ধ্যের পর অনেকেই এখানে বাঁশির আওয়াজ গরুদের গলার ঘোমটা ঘন্টার আওয়াজ ইত্যাদি শুনেছেন বহুদূর থেকে।
এছাড়া আমরা যখন এই মন্দিরে এসেছিলাম এই মন্দিরের পূজারী আমাদের কাছে একটি অলৌকিক কাহিনী বলেছিলেন| এই মন্দিরে নাকি একবার চোর চুরি করতে আসে মধ্যরাত্রে। চোরটি চুরি করতে এসেছিল রাখাল রাজার মূর্তিটিকে| কিন্তু মূর্তিটি ছোঁয়া মাত্র সে মন্দির চত্বরেই পড়ে যায় এবং গোগাতে থাকে, মুখ দিয়ে গেঁজলা বের হতে থাকে| ওঠার শক্তি হারিয়ে ফেলে সে| পরে গ্রামের লোকেরা এসে তাকে ওই অবস্থায় দেখে বুঝতে পারে পুরো ঘটনা। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়| কিন্তু সেই লোকটি বেশিদিন বাঁচেনি| ফলে মন্দির সম্বন্ধে যে অলৌকিক ধারণা সবার মনের মধ্যে ছিল তা আরো বদ্ধমূল হয়ে ওঠে |

জোড়বাংলা পদ্ধতিতে এই মন্দির নির্মিত হয়। দুটি
পাশাপাশি দোচালা কুটিরকে জোড়া করে এই মন্দির, কোনও শিখরদেশ নেই। ভেতরের অংশে রয়েছে
গর্ভগৃহ এবং তার সন্মুখভাগে অর্ধমণ্ডপ। মন্দিরটি মাটি থেকে ৪ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এবং
দক্ষিণমুখী। সামনে একটি নাটমণ্ডপ আছে। নাটমণ্ডপটি দাঁড়িয়ে আছে ১২টি থামের ওপর যে থামগুলিতে
রয়েছে শ্রীকৃষ্ণের লীলা সম্বলিত চিত্র। মন্দির অভ্যন্তরে রয়েছে গোপীনাথ ও রাখালরাজের
দারুবিগ্রহ। গোপীনাথ ত্রিভঙ্গঠামে দণ্ডায়মান বংশীধারী কৃষ্ণ। রাখালরাজ গোচারণরত শ্রীকৃষ্ণ
সোজাভাবে দণ্ডায়মান। বিগ্রহদের পূজা চলাকালীন ওই নাটমন্দিরে চলতে থাকে নামসংকীর্তন।
প্রায় ৪০০ জন লোক একসঙ্গে বসার সুযোগ আছে নাটমন্দিরে।
প্রতিবছর
মাঘ-ফাল্গুন মাসে রাখালরাজের অঙ্গরাগ
হয়। তার পর হয়
অভিষেক। রাখিপূর্ণিমার দিন অভিষেক হয়।
নাটমন্দিরের ১০ ফুট পূর্ব
দিকে মন্দিরের আদলে তৈরি অভিষেকের
জায়গা। মন্দিরের ১০০ ফুট সামনে
গিরিগোবর্ধনের মন্দির। মন্দিরে একটি গরু শায়িত
অবস্থায় আছে। কালী পূজার
পরের দিন প্রতিবছর গো-পার্বণ উপলক্ষ্যে গোবর্ধন পূজা হয়ে আসছে।
বছরের বিশেষ দিনে বিশেষ পূজা
হয়। জন্মাষ্টমীতে তেমন পূজা হয়।
ওই দিন রাতে অন্নভোগ
হয় এবং অন্নভোগের সঙ্গে
কচুর শাকের ঘণ্ট অবশ্যই থাকবে।
পরদিন নন্দোৎসব। এই উৎসবে সংকীর্তন
তো হয়ই, তাছাড়াও নারকেল
কাড়াকাড়ি, দইয়ের হাঁড়ি ভাঙা প্রভৃতি মজার
অনুষ্ঠান পালিত হয়। রামনবমীর দিনে
পালিত হয় রাখালরাজার দোল
উৎসব। গোবর্ধন মন্দিরের পাশেই যে দোল মন্দির
রয়েছে সেখানে গোপীনাথ জীউ ও রাখালরাজ
ওঠেন রাজবেশ পরিহিত অবস্থায়। আগের দিন চাঁচর
উৎসবে প্রচুর বাজি পোড়ানো হয়।
দোল উপলক্ষ্যে মেলা বসে। মন্দিরের
পেছনে একটি বড় ইঁদারা
আছে। তার জল ভোগের
কাজে ব্যবহৃত হয়। এখানকার বৈশিষ্ট্য
হল, কোনও ভক্ত গেলে
প্রসাদ গ্রহণ না করে ফেরেন
না। তবে সকাল ১০
টার মধ্যে গেলে সুবিধা হয়
সেবাইতগণের পক্ষে। রাখালরাজা এ অঞ্চলের জাগ্রত
দেবতা। ভক্তদের বিশ্বাস, তিনি রাত্রে এখানে
গোচারণ করেন তাই মন্দির
চত্বরে কারও থাকা নিষেধ।
এ তো গেল ভক্ত
ও দেবতার সংবাদ। এসব বাদ দিয়েও
জায়গাটি গাছপালায় ঘেরা এক মনোরম
স্থান। নাটমন্দিরকে ঘিরে রেখেছে বট,
অশত্থ, বেল, বকুল ও
তমাল। আছে ফাঁকা প্রান্তর,
নাটমন্দিরের পশ্চিমে বড়সড় খেলার মাঠ।
শীতকালে দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন আসেন
পিকনিক করতে। জায়গাটিতে পৌঁছলে একলহমায় মন ভাল হয়ে
যায়।